ব্যবসায়ীরা বলছেন, গার্মেন্ট, ওষুধশিল্প ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী প্রক্রিয়াকরণ শিল্প খাতের জন্য বন্ডেড ওয়ারহাউজের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা এ কাগজ নয়াবাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রশাসনের লোকজনের সামনেই।
পুরান ঢাকার নয়াবাজারের জিন্দাবাহার ১ নম্বর লেনে নূরজাহান পেপার মার্কেটকে বিদেশি কাগজের মার্কেট আর চাঁন মিয়া পেপার মার্কেটকে বন্ডের মার্কেট বলে ডাকেন ব্যবসায়ীরা।
অবৈধভাবে আনা এসব বিদেশি কাগজপণ্য মূলত বিক্রি হয় গোপনে। তবে ভারতীয় কৃষ্ণা, চীনের ড্রাগন, ডিয়ার দেদার বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় কৃষ্ণা ব্র্যান্ডের কাগজ আনা হচ্ছে।
জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান জানান, বন্ডেড সুবিধা নিয়ে বা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কাগজ চোরাইভাবে বিক্রির বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই। গত কয়েক বছরে আমাদের অভিযানের কারণে এই অপকর্ম অনেকটাই কমে গেছে। আমরা বেশ কয়েকটি চালান ধরেছি। এর পরও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার চললে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।
পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ লাগোয়া কাগজের পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সেখানে সবগুলো মার্কেটে দেশি কাগজ বেশি বিক্রি করলেও নূরজাহান পেপার মার্কেট এবং চাঁন মিয়া মার্কেটে বিদেশি কাগজ বিক্রি করা হচ্ছে বেশি। সস্তায় সেসব কাগজ কিনে নিচ্ছেন সাধারণ খুচরা বিক্রেতা এবং ক্রেতারা। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনার পর অবৈধ পন্থায় কালোবাজারির এ কৌশল এখন সবারই জানা।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দু’জন কাগজ ব্যবসায়ী জানান, চোরাই ও নিম্নমানের এসব কাগজ অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামে ছেড়ে দিচ্ছে। এতে যারা দেশি কাগজ বিক্রি করছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ১৮০ সাইজের দেশি কাগজ প্রতি মেট্রিক টন যেখানে বিক্রি করা হয় ৬৯ হাজার টাকায়, সেখানে কৃষ্ণা বিক্রি করা হয় ৫৯ হাজার টাকায়। অথচ ভারতীয় কাগজ বিক্রি হচ্ছে কম দামে। এতেই বোঝা যায়, অবৈধ না হলে বিক্রেতারা কম দামে দিতে পারতেন না।
তারা আরও বলেন, সব ধরনের বিদেশি কাগজই কম-বেশি বিক্রি হচ্ছে। এগুলো সবই অবৈধ। দুই-তিন বছর আগে একটু কড়াকড়ি করা হলে কৃষ্ণা ছাড়া বাকি ব্র্যান্ডের কাগজ গোপনে বেচা হতে থাকে; তবে কৃষ্ণা নিয়ে কারো রাখঢাক নেই।
আরেক ব্যবসায়ী বলেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ ব্যবসা চললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা বারবার বলার পরও কাস্টমস দেখতে এসেছিল। তারা এখন পুলিশ আর কাস্টমসের লোকজনকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা করছে।
সূত্র জানায়, যারা বিদেশি কাগজ বাজারে ছাড়ছে তাদের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। ওয়্যারহাউজ বা প্রক্রিয়াকরণ কারখানার নামে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আমদানি করা কাগজগুলো এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা নূরজাহান ও চাঁন মিয়া মার্কেটের কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে কম দামে বিক্রি করছেন। ভারতীয় কৃষ্ণার সব কাগজপণ্যই মিথ্যা ঘোষণায় বেনাপোল বন্দর হয়ে ঢুকছে। রাতের আঁধারে কিছু ট্রাক সরাসরি চলে আসে নয়াবাজারে। রাতভর পুলিশের সামনেই হয় পণ্য খালাস। আর দিনের আলোতে এসব কাগজ প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা অবৈধ কারবারের ব্যাপারে জানলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে মুখ বুজে থাকেন।
নূরজাহান ও চাঁন মিয়া মার্কেটের আর এস ইন্টারন্যাশনাল, শেখ এন্টারপ্রাইজ, আলিফা এন্টারপ্রাইজ, গোল্ডেন বার, মাহফুজ এন্টারপ্রাইজ, পনিক্স ইন্টারন্যাশনাল, এবি ট্রেডার্স, কম ট্রেডার্স, শাহান ট্রেডার্স, আল হোসাইন টেডার্স, এ টু জেড, সাদিয়া ট্রেডার্স, বাংলাদেশ পেপারের সামনে মজুদ করে কৃষ্ণাসহ বিদেশি কাগজ বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন বার্ড ইন্টারন্যাশনাল, অ্যানি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মমতাজ অ্যান্ড সন্স, সোহেল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, মহসিন অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং কবির অ্যান্ড ব্রাদার্স খোলাবাজারে বৈধ কাগজ বিক্রি শুরু করে। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জিয়া ট্রেডিং, সুজন এন্টারপ্রাইজ, কবির অ্যান্ড ব্রাদার্স ও আইনুল হক পেপার কাগজগুলো মজুদ করছিল।
প্রশাসনের অভিযানের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান নাম পাল্টে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযানে চালান ধরা পড়লেই প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে ফেলে তারা। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে কাগজ এনেও এই কালোবাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পুরনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ পেপার, জামাই সেলিম, আবুল হোসেনের প্রতিষ্ঠান যোগ হয়েছে এ সিন্ডিকেটে।
বাংলাদেশ সময়: ১০৩৪ ঘণ্টা, মে ০৮, ২০১৭
এসআই/এইচএ/