সম্প্রতি জেলার তাঁত সমৃদ্ধ উপজেলাগুলো ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্পটির করুন চিত্র পাওয়া গেছে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ মধ্যপাড়ার বাসিন্দা ক্ষুদ্র তাঁতী মো. শামীম।
একই এলাকার ছামান আলী আকন্দের চারটি তাঁতের মধ্যে বন্যার পানিতে ভেসে গেছে দু’টি। একটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় গড়ে তোলা তার তাঁত কারখানাটি এখন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ। রাশিদুল ইসলাম মফিজের তাঁত সংখ্যা ৬টি যার সবগুলোই বন্ধ রয়েছে।
চর সয়দাবাদের রহিমা খাতুনের ৭টি তাঁত বন্যার পানিতে নিমজ্জিত প্রায় ১৮ দিন। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে স্বামী আলম মিয়া অন্যের ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের কাজ করছেন। একই অবস্থা লিলি বেগমের স্বামী আব্দুল কুদ্দুছের। চর গাছাবাড়ি গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ৮টি, মনিরুলের ৩টি, শওকত আলীর ৪টি, আব্দুল মোন্নাফের ৩টি তাঁত বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে।
এছাড়াও সদর উপজেলার সয়দাবাদ, রতনকান্দি, মেছড়া, কালিয়া হরিপুর, বেলকুচি উপজেলার রাজাপুর, বেলকুচি সদর, দৌলতপুর, চৌহালী উপজেলার ঘোরজান, সদিয়া চাঁদপুর, স্থল, বাগুটিয়া, খাস কাউলিয়া, শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী, পোরজনা, গালা, রুপবাটি, সোনাতনী, জালালপুর, পোতাজিয়া ইউনিয়নের হাজার হাজার তাঁত কারখানা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এসব তাঁতে ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিছু কিছু তাঁত কারখানার পানি নামলেও তা মেরামত করতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে। আবার কিছু কিছু কারখানা চালু হতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে।
এসব অঞ্চলের প্রান্তিক তাঁতীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশিরভাগ ক্ষুদ্র তাঁতীই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা চালাচ্ছেন। মাসাধিককাল ধরে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়েছেন তারা। বর্তমানে অনেকেই দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
তাঁত মালিকরা আরও বলেন, ঈদের আগেই বড় একটি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন তারা। ঈদ উপলক্ষে প্রয়োজনীয় শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছা উৎপাদন করতে না পারলে চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র শ্রমিকদের ঈদ উৎসবও মাটি হয়ে যাবে বলে জানান অনেকেই।
এদিকে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন বন্যাকবলিত এলাকার তাঁত শ্রমিকরা। তারাও চড়া সুদে নেওয়া ঋণের টাকায় কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। কথা হয় তাঁত শ্রমিক মোহাম্মদ আলী, সেলিম রেজা, সোনাউল্লাহ, মনিরুল, ছানোয়ার হোসেন, আমিরুল ইসলাম নুরুল, সুজন ও সুমনসহ অনেকের সঙ্গে।
এসব তাঁত শ্রমিকরা বলেন, ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় বর্তমানে তাদের হাতে কোনো কাজ নেই। কেউ কেউ মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ সুদে টাকা ধার নিয়ে চলছেন। অনেকেই আবার ফ্যাক্টরি মালিকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মো. বদিউজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, জেলায় মোট প্রায় আড়াই লক্ষাধিক তাঁত রয়েছে। যার প্রায় অর্ধেক বন্যাকবলিত নিচু এলাকায়। এসব অঞ্চলের লক্ষাধিক তাঁত ডুবে যাওয়ায় তিন লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছেন এসব এলাকার কয়েক হাজার প্রান্তিক তাঁতী।
তিনি বলেন, এসব তাঁত কারাখানা এক থেকে দেড় মাসব্যাপী বন্ধ থাকায় জেলার অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাপড়ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এতে করে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পে চরম ধস নামার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সিরাজগঞ্জ লিয়াজোঁ অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আমরা সাধারণত ক্ষুদ্র তাঁতীদের ঋণ দিয়ে থাকি। আমাদের কাছে জেলার মোট তাঁতের পরিসংখ্যান নেই। তবে জেলার উল্লাপাড়া, বেলকুচি ও সদর লিয়াজোঁ অফিসে হস্তচালিত (হ্যান্ডলুম) তাঁতের একটি পরিসংখ্যান রয়েছে। তবে বিদ্যুৎচালিত (পাওয়ারলুম) তাঁতের সঠিক পরিসংখ্যান তাঁত বোর্ডের কাছে নেই।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জিহাদ আল ইসলাম বলেন, তাঁতশিল্প সিরাজগঞ্জের সবচেয়ে বড় একটি শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ১০ লাখ মানুষ। এবারের বন্যায় অসংখ্য তাঁতী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঈদের আগে এই ক্ষতির একটা প্রভাব পড়বে।
এদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মেদ বাংলানিউজকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত তাঁত ও তাঁতীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সুপারিশ করা হবে।
বাংলাদেশ সময়: ০৯৩৭ ঘণ্টা, আগস্ট ০১, ২০১৯
আরএ