ঢাকা, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাতীয়

অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনায় গ্রেফতার ৩

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৪৭ ঘণ্টা, জুন ২৮, ২০২২
অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনায় গ্রেফতার ৩

নড়াইল: ১৮ জুন নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে সহিংসতা এবং অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনায় পুরো দেশে তোলপাড় চলছে। এ ঘটনায় হাইকোর্টে রিট হয়েছে।

এলাকায় চলছে নানা ধরনের গুঞ্জন।

এর পর থেকে বাড়ি না ফিরে নিজেকে আড়াল করেছেন অধ্যক্ষ স্বপন কুমার। আতঙ্কে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না পরিবারের লোকেরা।

হেনস্তার বিষয়টিকে ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন কেউ কেউ। এদিকে ঘটনার ১০ দিন পরে সোমবার (২৭ জুন) বিকেলে সদর থানা পুলিশ বাদি হয়ে সহিংসতার দায়ে অজ্ঞাত ১৭০ থেকে ১৮০ জনের নামে মামলা করেছে। মামলায় ওই রাতেই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।

ঘটনার পর থেকে আগামী ১৮ জুলাই পর্যন্ত কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে নড়াইল সদর থানার একদল পুলিশ।

মঙ্গলবার (২৮ জুন) সরেজমিনে দেখা যায়, শুনশান নিরবতা বিরাজ করছে কলেজ প্রঙ্গণে।

দাপ্তরিক কাজে কলেজে আসা ইসলামীক শিক্ষা বিষয়ের প্রভাসক মো. আব্বাস আলী আকুঞ্জি বাংলানিউজকে বলেন, একজন অধ্যক্ষকে বিনা অপরাধে এভাবে জুতার মালা পরানো শিক্ষক সমাজের জন্য কষ্টের। বিষয়টিতে নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা নেই। এটা একটা ষড়যন্ত্র।

হিসাবরক্ষক মো. আলাউদ্দিন মোল্যা জানান, বিষয়টি পুরোটাই একটি ষড়যন্ত্র। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অধ্যক্ষের কোনো নাম ছিল না। এরপরই তাকে অপমানের জন্য সবাই মরিয়া হয়ে ওঠেন। তিনি তো রাহুল দেবকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। তার কোনোই অপরাধ ছিল না।

এছাড়া লোকজনের মাঝেও এ নিয়ে চলছে আলোচনা। এলাকার লোকেরা কেউ এখন আর ঘটনার দায় নিচ্ছেন না। শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর নিন্দা করছেন সবাই।

ঘটনার পরদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ স্বপন কুমারকে অব্যহতি দিয়ে কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আক্তার হোসেন কিংকুকে দ্বায়িত্ব দেওয়ার মৌখিক ঘোষণা আসে। এর পর থেকেই ঘটনার দায় চাপে কিংকুর কাধে।

আক্তার হোসেন কিংকু বাংলানিউজকে বলেন, আগে আমি সাড়ে ৬ বছর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দ্বায়িত্ব পালন করেছি। ওই দ্বায়িত্ব পালনের আর কোনো ইচ্ছে নেই। কিছু কুচক্রি মহল আমার ঘাড়ে দায় চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অধ্যক্ষ স্বপন বাবু একজন নিরীহ প্রকৃতির লোক। তাকে এভাবে অপমান করা পুরো শিক্ষক জাতির জন্য অপমানের। বিষয়টির তীব্র নিন্দা জানাই।

এদিকে অধ্যক্ষ স্বপনের বাড়ির সামনের মন্দিরে থাকছে পুলিশের পাহারা। বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার দিন থেকে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সবাই আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় আছেন। একেবারে এলোমেলো অবস্থা পুরো পরিবারের। এমনকি ভয়ে দুই মেয়ে পড়ালেখা করতে বাইরেও যেতে পারছে না। আর ১১ দিন ধরে নিখোঁজ হওয়া স্বপনের খোঁজ না পেয়ে তার বৃদ্ধ মা-বাবার খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

স্বপনের স্ত্রী সোনালী দাস প্রায় বাকরুদ্ধ। তিনি কান্না জড়ানো কন্ঠে বাংলানিউজকে বলেন, কী দোষে স্বপনকে এভাবে অপমান করা হলো? সেদিন থেকে তিনি বাড়িতে নেই। কোথায় আছেন, কী করছেন তার কিছুই আমনা জানি না। এদিকে আমরাও নিরাপদে নেই। কেমন যেন এক অজানা আতংকের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

স্বপনের মেয়ে জুই বিশ্বাস এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। কিন্তু ভয়ে যেতে পারছেন না স্কুলে-প্রাইভেটে। তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে, আমার পরীক্ষার কী হবে বলেই কেদে ফেলেন তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া আরেক মেয়ে ঘর থেকেই বের হচ্ছে না আর।

অধ্যক্ষের বাবা সুমন্ত বিশ্বাস বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের ভরসা না দিলে কিভাবে সাহস পাবো? পুলিশ পাহারায় থাকার পরেও তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আবারও কিছু ঘটবে না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

স্থানীয়রা জানান, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যেই হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। এর ১০ দিন পরে সোমবার সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ মোরছালিন বাদি হয়ে মামলা করেছেন। তাতে আড়পাড়া গ্রামের মালেক মুন্সীর ছেলে শাওন মুন্সী, মির্জাপুর গ্রামের সৈয়দ মিলনের ছেলে সৈয়দ রিমন আলী ও একই গ্রামের মনিরুল ইসলাম রুবেলকে মঙ্গলবার এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত কবীর।

পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় বাংলানিউজকে বলেন, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ কলেজ ও অধ্যক্ষের বাড়ি পাহারায় রেখেছে। অধ্যক্ষকে যখন জুতার মালা পরানো হয়, সেসময় আমি এবং জেলা প্রশাসক দুজনেই ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলাম। পুলিশ কঠোর হলে গুলি চালানো হতো। এতে হতাহতের সম্ভাবনা ছিল। সেটি আরও ভয়াবহ হতে পারতো। আমরা চেয়েছি তাদের নিরাপদে রাখতে।

উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন নড়াইল সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে রাহুল দেব নামে একাদশ শ্রেণীর এক ছাত্র নুপুর দেবকে সমর্থন করে ফেসবুকে পোষ্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে রনক্ষেত্র তৈরী হয়। এ সময় বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতা শিক্ষকদের তিনটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। তাদের দাবির প্রক্ষিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসসহ অভিযুক্ত ছাত্রকে জুতার মালা পরিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ সময়: ২১৪৬ ঘণ্টা, জুন ২৮, ২০২২
এফআর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa