ঢাকা, বুধবার, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ জুন ২০২২, ২৯ জিলকদ ১৪৪৩

আইন ও আদালত

‘দলিত’- বঞ্চিত এক জনগোষ্ঠীর নাম

মানবাধিকার ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭১৩ ঘণ্টা, নভেম্বর ৯, ২০১৪
‘দলিত’- বঞ্চিত এক জনগোষ্ঠীর নাম

আইনের চোখে সবাই সমান। সবাই আইনের কাছে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

শুধু আমাদের সংবিধানই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও অন্যান্য দেশের আইনেও মানুষের সমান অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

সব ধরনের বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করে একটি শোষণ ও বঞ্চনাহীন সমাজ গঠন করাই আধুনিক আইন ব্যবস্থার লক্ষ্য। একটি সময় ছিল যখন শাসকের কথাই আইন হিসেব গণ্য হতো। সামন্তবাদী ও রাজতান্ত্রিক সমাজে আইন ছিল শাসকের ইচ্ছার প্রতিফলন। অস্টিন বলেছেন, Law is the command of the sovereign। কিন্তু আমরা সে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে এসেছি।

কিন্তু তারপরও কিছু কিছু অতীত আমাদের সামনে এসে পড়ে। এ সমাজ আজও পুরোপুরি বৈষম্যমু্ক্ত হতে পারেনি। এ বৈষম্যের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে কিন্তু তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আজও বিরাজ করছে। রাষ্ট্রভেদে এ বৈষম্যের মাত্রাগত পার্থক্য আছে। কিন্তু তার অস্তিত্বকে আমরা অস্বীকার করি কীকরে?

আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ এ আছে, রাষ্ট্রে আইনের চোখে সবাই সমান। কোনো রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই এটা বলা যায়, এ দেশের সব নাগরিক কোনো রকম বৈষম্য ও ব্যবধান ছাড়া আইনের কাছে সমান সুযোগ সুবিধা পাবে ও সমান আশ্রয় লাভ করতে পারবে। এটাই ২৭ অনুচ্ছেদের মূল কথা। কিন্তু তারপরও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। সমান সুযোগ পাওয়াতো দূরের কথা, অনেক সময় সাধারণ মানুষ আইনের দারস্থও হতে পারে না। আমাদের আইন ও বিচার ব্যবস্থা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে সহজপ্রাপ্য কোনো বিষয় নয়।

এর একটি কারণ হতে পারে আমাদের শতাব্দী প্রাচীন আইন ব্যবস্থা। সময়ের সাথে সাথে অনেক আইনেরই পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে জনগণের জন্য আইনের শাসন ও সুবিচার যারা নিশ্চিত করবেন তাদের মানসিকতা ও ধ্যানধারণার পরিবর্তন ছাড়া এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।
  
মানবাধিকার রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সহায়ক প্রতিষ্ঠান করা হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক অপরাধ বেড়েই চলছে।

২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া আছে বিভিন্ন ধরনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করে।

ধর্ম-বর্ণ-গোত্র কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতেই কাউকে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কেবল আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারই নয়, রাষ্ট্র প্রদত্ত অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা থেকেও কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। আমাদের সংবিধান সে কথাই বলে।

কিন্তু তারপরও দেশের প্রায় কয়েক লক্ষ জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার। দলিত জনগোষ্ঠী আজও নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার।

সামাজিক এ বৈষম্যগুলো খুব আনুষ্ঠানিকভাব যে বিরাজ করছে তা নয়। আমাদের সামাজিক আচার-ব্যবহার ও প্রথা ও লোকাচারে এ বিষয়গুলো বিরাজ করে। দীর্ঘদিন ধরে দলিতসহ আরো কয়েকটি জনগোষ্ঠী সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে যাচ্ছে।

দেশের দলিত জনগোষ্ঠী যেমন বিভিন্ন ধর্মের অনুসারি আছে তেমনি আবার কিছু আছে বাঙালি আবার কিছু অবাঙালিও। ধর্ম ও জাতিভেদে সবাই বৈষম্যের শিকার। কেউ কম আর কেউ বেশি।  

তারা অনেক পুরুষ ধরেই বিভিন্ন পেশায় জড়িত। বংশপরম্পরায় তারা সাধারণত নিজনিজ পেশাই বরণ করে। এটাই তাদের জীবিকা নির্বাহ করার উপায়। অনেকে এ পেশা ছাড়তে চাইলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর কারণ, তাদের অস্বচ্ছল অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।  
 
একজন সাধারণ নাগরিকের যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থাকে তার অনেকগুলো থেকেই তারা বঞ্চিত। সংবিধানও এ দলিত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে নিশ্চুপ। যদিও সংবিধানে সব সম্প্রদায়ের জন্য পৃথকভাবে কিছু বলার প্রয়োজনও নেই। কারণ, সংবিধান বলতে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রতি কোনো বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। কিন্তু রাষ্ট্রকেই এ বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ ও অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

যদিও ভারতের সংবিধানে দলিত সম্প্রদায়সহ আরো কয়েকটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বলা আছে। ভারতের সংবিধানের ১৬ অধ্যায়টি এরকম তফশিলিভুক্ত জনগোষ্ঠীর অধিকার সম্পর্কে বিভিন্ন বিধান আরোপ করা হয়েছে। সংসদ বা লোকসভা আব অন্যান্য আইন পরিষদেও তাদের জন্য পৃথক আসন বরাদ্দের কথা বলা আছে। এছাড়া, চাকুরি ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা আছে। তাদের জন্য একটি পৃথক কমিশন গঠন করার কথাও বলা আছে। ১৯৯৫ সালে ভারতীয় লোকসভায় হরিজনদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে আইন পাশ করা হয়। আমাদের সংবিধানে সেরকমটি নেই, তবে তার মানে এই নয়, আমাদের সংবিধান তাদের অধিকার স্বীকার করে না। প্রশ্নটি হলো বাস্তবায়ন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির।  

শিক্ষার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। আবার সব স্কুলে তারা ভর্তিও হতে পারে না। এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই। এমনকি সব জায়গায় তারা বসবাসও করতে পারে না।

শিক্ষায় তাদের পিছিয়ে পড়ার হার অনেক বেশি। প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী নিরক্ষর। তারা যে আয় রোজগার করে তা দিয়ে পরিবার পরিচালনাই কঠিন, শিক্ষা বা অন্যান্য সামাজিক প্রয়োজন মেটানো তাদের পক্ষে অসম্ভব।
 
নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট জায়গাতেই তাদের ঘরবাড়ি বানিয়ে থাকতে হয়। এমনকি মৃত্যুর পর দাফনের জায়গাও অনেক সময় জোটে না। সব গোরস্থানে তাদের জায়গা হয় না।

চাকালি, হেলা, কাপুলু বাল্মিকী, মুচি, হরিজনরা, ডোমার, ডোম, রবিদাস, ডালু, মালা, সাচ্চারি ইত্যাদি জনগোষ্ঠী্সহ আরো অনেক জনগোষ্ঠী শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সামাজিক মর্যাদাতো দূরের কথা এক মারাত্মক মানবেতর জীবন যাপন করে তারা। এছাড়া জীবন যাত্রা সবগুলো মাপকাঠিতেই তারা একটি অনগ্রসর ও বঞ্তি জনগোষ্ঠী। তাই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবিক মর্যাদা দিতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের মূলস্রোতে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৭১৪ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৯, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa