ঢাকা, সোমবার, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭

সারাদেশ

মানিকগঞ্জে কোটি টাকার সেতুতে নেই আলো, নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ

সাজিদুর রহমান রাসেল, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫:৪৮, আগস্ট ৩১, ২০২৫
মানিকগঞ্জে কোটি টাকার সেতুতে নেই আলো, নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ মানিকগঞ্জের কালিগঙ্গা নদীর ওপর বালিরটেক সেতু

মানিকগঞ্জের কালিগঙ্গা নদীর ওপর বালিরটেক সেতু নির্মাণের পর থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকাংশে উন্নত হয়েছে। সর্বসাধারণের জন্য সেতুটি উন্মুক্ত করার পর থেকেই যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে এ অঞ্চলের।

সেতুটি চালু হওয়ার পরে রাজধানীর সঙ্গে দূরত্ব কমেছে প্রায় ২৫ কিলোমিটার।  

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধিনে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে। পরবর্তীকালে ২০২০ সালের শুরুর দিকে এই সেতুটি উদ্বোধন করেন সাবেক সরকার প্রধান। জেলার বালিরটেক কালিগঙ্গা নদীর ওপর ৪৫৬ মিটারের দীর্ঘ সেতুটি দক্ষিণ মানিকগঞ্জের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। তবে সেতুটির ওপর স্ট্রিট লাইটের আলোর দেখা মিলেছে না প্রায় কয়েক বছর আর এখন তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  

দক্ষিণ মানিকগঞ্জের কাঙ্ক্ষিত সেতু দিয়ে দিনের আলোয় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিকভাবে করলেও সন্ধ্যার পর সেতুটি অন্ধকারে ছেয়ে যায়। দীর্ঘ এই সেতুর ওপরে স্ট্রিট লাইট থাকলেও আলোর ব্যবস্থা না থাকায় নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ী, মোটরসাইকেল আরোহী, অটোরিকশার যাত্রীসহ হেঁটে চলাচলকারীরা। দিনের আলো অস্ত যাওয়ার পরপরই সেতুর পরিবেশের পরিবর্তন হয় এবং ভুতুড়ে রূপ নেয়। উঠতি বয়সী কিশোর গ্যাং ও খুচরা ও পাইকারি মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্যের কারণে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে না।
 
এই সেতুর কল্যাণে এখন কৃষকরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের উৎপাদিত ফসল সহজেই পৌঁছে দিতে পারছেন। ফলে বাড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। তবে দিন শেষে যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন এই সেতুতে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। দিনের বেলায় যানবাহন চলাচলে তেমন কোনো সমস্যা দেখা না দিলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চুরি, ছিনতাইয়ে মতো ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলছে। এছাড়াও রয়েছে মাদককারবারিদের দৌরাত্ম্য।  

সেতুটিতে বৈদ্যুতিক সংযোগ না থাকায় প্রতিটি স্ট্রিট লাইট প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্বলছে না আর এতে হেঁটে ব্রিজে চলাচল করেন যারা তারা মাঝেমধ্যেই ছিনতাইয়ের মতো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হন।  

অপরদিকে আলো অস্পষ্ট হওয়ায় দুর্ঘটনার শঙ্কা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেতুর বৈদ্যুতিক লাইট অচল থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকাটি অন্ধকারে ডুবে যায়। সেই অন্ধকারে পথচারী, চালক, বাইকার, এমনকি ব্যবসায়ীরাও চলেন আতঙ্ক নিয়ে। কালিগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি দুই পাশের স্থানীয় বড় বাজারগুলোর ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যাতে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হয়।

দিনমজুর মুহাম্মদ আসিফ হোসাইন বলেন, সেতু উদ্বোধনের প্রথম দিকে বেশ কয়েকদিন আলো জ্বলেছিল তার পর থেকে আর আলো জ্বলেনি। দিনের বেলায় তেমন কোনো সমস্যা হয় না তবে সন্ধ্যার পর থেকে সেতুটি অন্ধকারে ঢেকে যায়। আগে স্থানীয়রা সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে চলাচল করতে পেরেছে কিন্তু ইদানিং সম্ভব হয় না। দিনের আলো অস্ত যাওয়ার পর থেকে বখাটেদের দখলে থাকে পুরো সেতু আর এর মধ্যে যদি কোনো নারী হেঁটে যায় তবে তাকে নানা ধরনের ইভটিজিং এর শিকার হতে হয়।

স্থানীয় কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থী মুহাম্মদ বিল্লাহ মোল্লা বলেন, আমি গত বছর এইচএসসি পাশ করার পর ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বাবার ব্যবসা দেখা-শুনা করছি। আমাদের এই অঞ্চলটা আগে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে প্রসারিত, তবে সেতু হওয়ার পরে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষ ছোট বড় অনেক ধরনের ব্যবসা করে জীবন-জীবিকা চালিয়ে থাকেন। এই সেতু যেমন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছে ঠিক দুশ্চিন্তার কারণও হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ি যেতে হয়। অনেক সময় সেতু পার হওয়ার জন্য অটোরিকশা পাওয়া না গেলে হেঁটেই পার হতে হয় বালিরটেক সেতুটি।  

বালিরটেক সেতু সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা জাফর মোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন পরে সেতু নির্মাণ শেষ হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখন এই সেতুই আবার আতঙ্কের কারণও হয়েছে। বিশাল সেতুতে নেই সঠিক রেলিং, নেই বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা, শুধু আছে লোক দেখানোর মতো লাইটিংয়ের খুঁটি (স্ট্রিট লাইট)। এই সেতুটি উদ্বোধনের পর কিছুদিন আলো জ্বলেছে কিন্তু এখন আর জ্বলে না। আলো না জ্বলার কারণ জানতে চাইলে বিদ্যুৎ অফিস বলেছে, বিল না দেওয়াতে লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর সেতুর পাশেই থাকা বৈদ্যুতিক তারগুলো মাদকসেবীসহ টোকাইরা নিয়ে গেছে। সেতুটি অন্ধকার থাকায় প্রতিনিয়তই সন্ধ্যার পর ঘটে বিভিন্ন ধরনের ক্রাইম।

সেতু দিয়ে চলাচলকারী মোটরসাইকেল আরোহী নাঈম আজাদ বলেন, আমি প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে চলাচল করি। দিনের বেলায় তেমন সমস্যা না হলেও সন্ধ্যার পর থেকে আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করতে হয়।  

সেতুটিতে নেই আলোর ব্যবস্থা, নেই সঠিক রেলিং আবার রেলিংয়ের ওপর লোহার নাটগুলো যেভাবে বের হয়ে আছে তাও ঝুঁকিপূর্ণ। সেতুটি উদ্বোধনের পরে থেকে বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

গাড়ি, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা যে যানবাহনই হোক না কেন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সেতুর ওপর পড়লেই মাথা কিংবা চোখে আঘাত পান যাত্রীরা। ওই রেলিংয়ের অসমাপ্ত লোহার নাটগুলোর কারণেই অনেকেই মারাও গেছেন। আমরা চাই দ্রুত সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর সমাধান করবেন।

মহিদুর রহমান নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই বাজারে ব্যবসা করে আসছি। সেতু নির্মাণের পর ভেবেছিলাম এখন আর আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের ভয় অনেকাংশেই কমে যাবে। সেতুর উদ্বোধনের পর বেশ কিছুদিন নির্বিঘ্নেই চলাচল করেছি। গত কয়েক বছর সেতুর ওপর স্ট্রিট লাইট বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ঝুঁকি বেড়ে গেছে। মাঝেমধ্যেই ঘটে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। স্ট্রিট লাইট জ্বললে বখাটে ও মাদকসেবীদের উৎপাত কমে আসতো।

মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বালিরটেক সেতুর লাইটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হয়তো একটি সময় বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকতে পারে কিংবা তারগুলো চুরি হওয়ার কারণে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে আমার ধারণা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মানিকগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এবিএম খোরশেদ আলম বলেন, বালিরটেক সেতুর বৈদ্যুতিক বাতির তারগুলো চুরি হওয়ার কারণে লাইটগুলো জ্বলছে না। এরই মধ্যে আমরা মেনটেনেন্স ফান্ডের আওতায় সোলার স্ট্রিট লাইটের ব্যবস্থা করবো এবং এতে সেতুর ওপর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সচল হয়ে যাবে। ডিজাইন অনুযায়ী সেতুর রেলিংয়ের পরিমাপ ঠিক আছে, এর কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নাই।  

আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।