ঢাকা, শনিবার, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭

মুক্তমত

ছাত্রসংসদ নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মহড়া

অদিতি করিম | সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ
আপডেট: ১০:২১, আগস্ট ২৯, ২০২৫
ছাত্রসংসদ নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মহড়া অদিতি করিম

•    ডাকসু নির্বাচন যদি শেষ পর্যন্ত সুন্দর, সুষ্ঠুভাবে হতে পারে, তাহলে নিঃসন্দেহে জাতীয় নির্বাচনের একটি আবহ তৈরি হবে, দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে
ডাকসুসহ চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেশবাসীর আগ্রহ ডাকসু নির্বাচন ঘিরেই।

ডাকসুকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় পার্লামেন্ট’। জাতীয় নির্বাচনের আগে ডাকসু নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এই নির্বাচন কেমন হবে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার কিছুটা হলেও প্রভাব থাকবে। ডাকসু নির্বাচন যদি শেষ পর্যন্ত সুন্দর, সুষ্ঠুভাবে হতে পারে, তাহলে নিঃসন্দেহে জাতীয় নির্বাচনের একটি আবহ তৈরি হবে, দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। ডাকসু নির্বাচনের সফলতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে করতে উৎসাহ জোগাবে। অন্যদিকে শেষ পর্যন্ত যদি ডাকসু নির্বাচনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে তার মাশুল দিতে হবে গোটা দেশকে।

এর ফলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ হুমকির মুখে পড়তে পারে। ডাকসু নির্বাচন এমন এক সময় হতে যাচ্ছে, যখন শিক্ষার্থীদের নানা রকম দাবিদাওয়ায় শিক্ষাঙ্গন ও রাজপথ উত্তপ্ত। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার চেয়ে আন্দোলন বেশি। জুলাই বিপ্লবের পর গত এক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারেনি, শিক্ষার্থীরা তাঁদের পাঠ্যক্রমে মনোযোগ দিতে পারেননি।

এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা কাঠামোকে ঠিক করতে, শিক্ষাঙ্গনে পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উপদেষ্টা বদল করেছে বটে, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর। ডাকসু নির্বাচনের যখন আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং অন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তিন দফা দাবিতে রাজপথে আন্দোলন শুরু করেছে। গত বুধবার এই আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়।

সামনে এই আন্দোলন কোন দিকে গড়ায় সেটি দেখার বিষয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে অস্থিরতা। ডাকসু নির্বাচন নিয়েও অস্বস্তি এবং নানা শঙ্কা আছে। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে চাপা উত্তাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিরা একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের বাক্যবান ছুড়ে মারছে। এ নিয়ে মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিবেশ উত্তপ্ত হচ্ছে। কোনো কোনো মহল থেকে একটি আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অনেকে মনে করেন, নির্বাচনে এ ধরনের পরিবেশ থাকাই স্বাভাবিক। শেষ পর্যন্ত সব মহল দায়িত্বশীল আচরণ করবে সেটিই দেশবাসী প্রত্যাশা করে। ডাকসু নির্বাচনে কে জয়ী হলো, কে পরাজিত হলো সেটি বড় কথা নয়। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন যদি শেষ পর্যন্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সারা দেশে একটি স্বস্তির বার্তা দেবে।

আমরা লক্ষ করছি, ডাকসু প্রতিষ্ঠার পর এর আগে ৩৭ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৯ সালে। ওই নির্বাচনটিও কলঙ্কিত হয়েছিল এবং ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগকে বিজয়ী করতে প্রশাসন নানারকম অপকৌশল নিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি ওই নির্বাচনে। আর সে কারণে ২০১৯ সালে ডাকসু তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ডাকসু শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারেনি।

স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে মাত্র সাতবার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একমাত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিয়মিতভাবে ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন। সে সময় তিনটি ডাকসু নির্বাচনে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন জয়ী হয়েছিল। দুটিতে জাসদ ছাত্রলীগ এবং একটিতে মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে বাসদ ছাত্রলীগ জয়ী হয়। এই গণতান্ত্রিক চর্চা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দেন। এরশাদ শাসনামলের শেষদিকে শিক্ষার্থীদের চাপে দুটি ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। একটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন সম্মিলিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা, ছাত্রলীগের সুলতান মাহমুদ মনসুর। পরের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিল। ’৯০ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসুর ওই নির্বাচনের পরপরই স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন তীব্রতা পায়। আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বে ডাকসু স্বৈরাচার পতনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ১৫ বছরে মাত্র একবার ডাকসু নির্বাচন করে। সেই ডাকসু নির্বাচন এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন ছাত্রলীগ বিজয়ী হয়। এবার ডাকসু নির্বাচনে আশা করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সরকার এবং কোনো পক্ষেরই কোনো স্বার্থ নেই। শিক্ষার্থীরা তাঁদের নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকেই নির্বাচিত করবেন। গত ২৬ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া প্রচারণার ধরন দেখলে বোঝা যায়, ডাকসুতে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে ক্যাম্পাসের দাবিদাওয়া, সমস্যা এসেছে বেশি। বিশেষ করে আবাসন সংকট, শিক্ষার মানোন্নয়ন, লাইব্রেরি, গবেষণা ইত্যাদি বিষয় নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাধান্য পাচ্ছে। এটি ইতিবাচক। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, ডাকসু নির্বাচন যেকোনো মূল্যে সুন্দর এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো নয়, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকারকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এরই মধ্যে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কাজ শুরু করে দিয়েছে। নির্বাচন বানচালের জন্য নানা মহল নানা চক্রান্তে লিপ্তও রয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, ‘সরকারের ভেতরের একটি অংশ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। ’ তিনি নিশ্চয়ই জেনে বুঝে এই অভিযোগ করেছেন। বাস্তবিকই সরকারের কিছু কিছু উপদেষ্টা এবং সরকারের কিছু মহলের কর্মকাণ্ডে মনে হয়, নির্বাচনের ব্যাপারে তাঁদের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত। যেকোনো অবস্থাতেই আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। নির্বাচিত সরকার ছাড়া বিদ্যমান সংকট সমাধানের কোনো পথ নেই।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে সেটির ব্যাপারে এখন পর্যন্ত নজরদারির অভাব রয়েছে। তবে সবাই আশা করেন, নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এ বিষয়ে সরকার কাজ শুরু করবে। রাজনৈতিক দলগুলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় বাংলাদেশকে পথ দেখায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় আমাদের আলোকিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ভূমিকা রাখে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কাজেই আগামী ৯ সেপ্টেম্বর যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেটি যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, একটি অনুকরণীয় নির্বাচন যদি হয়, তাহলে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও সেটি পথ দেখাবে। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারার বাংলাদেশ বিনির্মাণের ব্যাপারে সবাই আশাবাদী হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। এখান থেকেই আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। কাজেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণে ডাকসু নির্বাচন বাংলাদেশকে পথ দেখাবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য এটি অনুপ্রেরণা হবে। তাই আমরা আশা করি, সব ছাত্রসংগঠন সহিষ্ণুতার পরিচয় দেবে, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখাবে। এখানে জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, আন্দোলনে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন পথপ্রদর্শক, ঠিক তেমনি একটি সুষ্ঠু ডাকসু নির্বাচন উপহার দিয়ে গণতন্ত্র চর্চার উদাহরণ তৈরি করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর সে কারণেই ডাকসু নির্বাচন বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি মহড়া। এটি গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষাও বটে।

লেখক: নাট্যকার ও কলাম লেখক
ইমেইল: [email protected]

এসআই
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।