যশোর: ৪ এপ্রিল, ১৯৭১। মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন যশোর শহরের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে এদিন পাকহানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে রেহাই পায়নি যশোরের রাজনীতিক, শিক্ষক, ছাত্র ও পেশাজীবী ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ কেউই।
৭১’র ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর ৪৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি ৭১’র ভয়াল ৪ এপ্রিলের দেশমাতৃকার তরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া ৫১ শহীদের। এসব শহীদ পরিবার এখনও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় অপেক্ষায় প্রহর গুণে চলেছেন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ওই শহীদদের ত্যাগের স্বীকৃতি না দেওয়ায় নতুন প্রজন্মও তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে পারছে না। শহীদ পরিবারের সদস্যদের দাবি ৪ এপ্রিল যশোরের শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে তাদের স্মরণে স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের দিনগুলোর পর এপ্রিলের শুরু থেকেই গোটা বাঙালি জাতির মতো যশোরবাসীও পুরোদমে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। এই যুদ্ধপ্রস্তুতিকে থামিয়ে দিতে মাঠে নেমে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাক আর্মি শহরের বিভিন্ন স্থানে চালাতে থাকে বর্বরোচিত হামলা।
যশোরে তাদের সবচেয়ে নৃশংসতম হামলার ঘটনা ঘটে ৪ এপ্রিল। এদিন যশোর ক্য্যান্টনন্টের পাক বাহিনীর সদস্যরা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালায়। তারা প্রকাশ্যে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে অর্ধশতাধিক বাঙালিকে। এদিন সবচেয়ে বড় ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে।
সেদিনের সেই নারকীয় তাণ্ডবের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী রেলস্টেশন এলাকার শেখ আব্দুর রহিম বাংলানিউজকে জানান, ভোরে শহরের রেলস্টেশন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ফজরের নামাজ শেষ করে কোরআন শরীফ পাঠ করছিলেন। এমন সময় স্থানীয় বিহারীদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাণ্ডব শুরু করে।
এ সময় মাদ্রাসার বড় হুজুর আবুল হাসান যশোরী তাদের নিবৃত করতে গেলে অবাঙালিরা পাক আর্মিদের জানায়, ‘এরা সবাই ইপিআর; পাকিস্তানের শত্রু। এরপরই পাক আর্মি নির্বিচারে গুলি চালায়।
মাদ্রাসা প্রাচীরের ওপর থেকে এই দৃশ্য দেখে পালিয়ে যান আব্দুর রহিম। পরে দুপুরের দিকে তিনি এবং তার ভাই জাহাঙ্গীর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এসে দেখেন রক্তে ভেসে গেছে গোটা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। সেখানে শুধুই লাশ আর লাশ। এখানে পাওয়া যায় ২৩ জনের মৃতদেহ। এদের মধ্যে ১৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও বাকি ৭ জনের পরিচয় আজও জানা যায়নি।
মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আত্মরক্ষার জন্য খোঁড়া গর্তে রহিম ও জাহাঙ্গীর লাশগুলো একের পর এক সাজিয়ে মাটিচাপা দেন। সেদিনের নৃশংস ঘটনাটি বর্তমানে মাদ্রাসা ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত।
এখানে নিহতদের যে ১৬ শহীদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হলেন একই পরিবারের তাহের উদ্দিন, এবিএম আব্দুল হামিদ ও এবিএম কামরুজ্জামান এবং একই এলাকার কাজী আব্দুল গণি ও তার ছেলে কাজী কামরুজ্জামান। একই পরিবারের ৩ সদস্য তৎকালীন খুলনা কমিশনার অফিসের কর্মচারী দীন মোহাম্মদ, সম্মিলনী স্কুলের শিক্ষক আইয়ুব হোসেন ও কাজী আব্দুল কালাম আজাদ, রেলস্টেশন মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা হাবিবুর রহমান ওরফে কাঠি হুজুর, শহীদ সাংবাদিক গোলাম মাজেদের বাবা জিলা স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রউফ, শহর আলীর ছেলে আবু কালাম এবং মাদ্রাসার ছাত্র আতিয়ার রহমান ও নোয়াব আলী, লিয়াকত আলী, মাস্টার আব্দুর রফিক ও আক্তার হোসেন।
একইদিনে শহরের গুরুদাসবাবু লেনেও চলে পাক হানাদারদের নারকীয় তাণ্ডব। এই লেনের বাড়ি থেকে অ্যাড. সৈয়দ আমীর আলী ও তার তিন ছেলে এমএম কলেজের বিকম শেষ বর্ষের ছাত্র সৈয়দ নুরুল ইসলাম বকুল, বিকম শেষবর্ষের ছাত্র সৈয়দ শফিকুর রহমান জাহাঙ্গীর এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থী আজিজুল হককে পাক সেনারা ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে নির্মম নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়।
এদিন অপর এক অপারেশনে হানাদার বাহিনী শহরের ক্যাথলিক গির্জায়ও আক্রমণ চালায়। সেখানে গির্জার ইতালিয়ান ফাদার মারলো ভারনেসিসহ ৬ জনকে হত্যা করে তারা।
এছাড়াও একইদিনে শহরের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন তৎকালীন যশোর শহর ছাত্রলীগের সভাপতি এমএম কলেজের ছাত্র মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এমএম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মোছাদ্দেদ আলী, ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক, নিখিল রায়, নাসিরুল আজিজ, অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, আওয়ামী লীগ নেতা রহমত আলী, তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট রহমতউল্লাহ, ইপিআর সদস্য আব্দুল মান্নান, ক্রিকেটার স্বপন বিশ্বাস, ডা. নাসির উদ্দিন ও মিসেস নাসির, আব্দুর রহমান, লুৎফর রহমান, মিসেস জাবেদা লুৎফর, চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ, মাহবুব এবং ভোলাট্যাংক রোডের অবসরপ্রাপ্ত সেরেস্তাদার আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী।
এই শহীদদের পরিবারের সদস্যরা আজও সেই নির্মম ও দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এই শহীদদের কোনো স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা হতাশ।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের আশা শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। নতুন প্রজন্মকে সেদিনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস জানানোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি তাদের।
বাংলাদেশ সময়: ১২০১ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৪, ২০১৪