ঢাকা, শনিবার, ১ কার্তিক ১৪২৮, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতীয়

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারীকে হত্যা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬০৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১
প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারীকে হত্যা

ঢাকা: বাগেরহাটের মোংলা থানার চিলা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের প্রতিপক্ষ মেম্বার প্রার্থী বিল্লাল সরদারকে ফাঁসাতে কোনো একজনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন একই ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. হালিম হাওলাদার। তিনি বর্তমানে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর (মেম্বার)।

হত্যাকাণ্ডের ২০ দিন আগে জামাল ওরফে সামাদুজ্জামান নামে এক ভাড়াটে খুনির সঙ্গে মোংলায় দেখা করেন হালিম। কোনো একজনকে খুন করতে অগ্রিম হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা ও বিল্লাল সরদারের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জামালকে দেওয়া হয়। খুনের কন্ট্রাক্ট পেয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী পারুল বেগম নামে এক নারীর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় শুরু করেন জামাল। পরে তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সাভারের বক্তারপুরের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে খুন করেন। পরে ঘটনাস্থলে বিল্লাল সরদারের এনআইডির ফটোকপি ফেলে পালিয়ে যায় তিনি।

নিহত পারুলের বাড়ি মেহেরপুর জেলার গাংনী সিন্দুর কোটা মটমোড়া এলাকায়। ঘটনাস্থলে পাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপির সূত্র ধরেই চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিন আসামিকে গ্রেফতারসহ হত্যার রহস্য উদঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সোমবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন পিবিআই প্রধান ও ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

তিনি বলেন, এটি একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড হওয়ায় পিবিআই ঢাকা জেলা স্ব-উদ্যোগে মামলাটির তদন্ত অধিগ্রহণ করে। মামলাটি তদন্তকালে এনআইডি কার্ডের সূত্র ধরে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মূল ঘাতক মো. জামাল হাওলাদার ওরফে সামাদুজ্জামানকে (৫০) গত ২২ সেপ্টেম্বর রাতে ও পরদিন হত্যা পরিকল্পনার সহযোগী দর্জি মাস্টার মশিউর রহমান ওরফে মিলন কবিরাজকে (৪৬) মিরপুর দারুসসালাম এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। সবশেষ সোমবার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হালিম হাওলাদারকে (৫২) বাগেরহাট জেলার মোংলা থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ তিন আসামির মধ্যে দু’জন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আসামি হালিম হাওলাদারের বাড়ি বাগেরহাটের মোংলার পশ্চিম মচিলায়। তার বার নাম হামিদ হাওলাদার। তিনি মোংলা থানার ৬ নং চিলা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী বিল্লাল সরদারকে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের আনুমানিক ২০ দিন আগে হালিম মেম্বার ঘাতক জামাল সামাদুজ্জামানের সঙ্গে মোংলায় দেখা করেন। ৩০ হাজার টাকায় একটি লাশ ফেলার চুক্তি হয়। অগ্রিম দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা। শর্ত থাকে, প্রতিপক্ষ মেম্বার প্রার্থী বিল্লাল সরদারের এনআইডির ফটোকপি ফেলে যেতে হবে হত্যাকাণ্ডের স্থানে। সে জন্য হালিম নিজেই বিল্লালের এনআইডি কপি সংগ্রহ করে ভাড়াটে খুনি জামালের হাতে দেন।

ঘাতক জামাল তার বন্ধু দর্জি মাস্টার মশিউর রহমান ওরফে মিলন কবিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার কথা মতো পূর্ব পরিচিত ও কথিত বান্ধবী পারুল বেগমকে টার্গেট করেন জামাল। পারুল বেগম বাচ্চাদের জামা কাপড় তৈরি করে নিজেই ফেরি করে বিক্রি করতেন। ঘাতক জামাল পারুল বেগমের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে ও তাকে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে সাভারের বক্তারপুরে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিতে প্রলুব্ধ করেন।

তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভারের বক্তারপুর নামা বাজার এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন। পরিকল্পনা মতে ওই রাতেই পারুল বেগমকে ভাড়াটে খুনি জামাল হাওলাদার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশের পাশে বিল্লাল সরদারের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি ফেলে রেখে যান।

সেই এনআইডির সূত্র ধরে পিবিআই বিল্লাল সরদারকে খুঁজে বের করে। তদন্ত করে নিশ্চিত হয় যে, বিল্লাল হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তদন্ত দল জানতে চায়, তার কোনো শত্রু রয়েছে কিনা। বিল্লাল তার প্রতিপক্ষ মেম্বারপ্রার্থী হালিম হাওলাদারসহ কয়েকজনের নাম জানান।

তদন্ত দল জানতে পারে হত্যাকাণ্ডের আগে পরে হালিম হাওলাদারের সঙ্গে ঢাকায় অবস্থানরত এক ব্যক্তির খুব ঘন ঘন যোগাযোগ হয়েছে। তার ব্যাপারে অনুসন্ধান করে ঘাতক জামাল হাওলাদার ওরফে সামাদুজ্জামানের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেফতার করে পিবিআই। গ্রেফতার জামালের ছবি সাভারে ভাড়া বাসার কেয়ারটেকারকে দেখালে তিনি জামালকে শনাক্ত করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয় স্বীকার করেন জামাল। পরিকল্পনায় জড়িত হালিম মেম্বারসহ সবারর নাম প্রকাশ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। গ্রেফতার অপর সহযোগী পরিকল্পনাকারী দর্জি মাস্টার মিলন কবিরাজও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই নিশ্চিত হয়ে মূল পরিকল্পনাকারী বাগেরহাটের মোংলা থানার চিলা ইউনিয়নের মেম্বার প্রার্থী হালিম হাওলাদারকে গ্রেফতার করে।

এক প্রশ্নের জবাবে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, খুনি জানে না কাকে খুন করতে হবে। খুনের শিকার নারী জানতেন না কী ছিল তার অপরাধ। শুধু প্রভাব বিস্তার, ইউপি নির্বাচনে জেতার জন্য ওই নারী খুনের শিকার হন। একটা বিষয় খুবই স্পষ্ট, খুনির পরিকল্পনায় ছিল নারী আর নিম্ন আয়ের মানুষ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পিবিআই-এর অতিরিক্ত ডিআইজি সায়েদুর রহমান, বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল, এসপি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন।

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫৯ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১
এসজেএ/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa