ঢাকা, সোমবার, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭

জাতীয়

ভ্রমণবিলাসী সাইফুজ্জামান পাচার করেছেন ৬২০০ কোটি টাকা

নিউজ ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯:৩৪, আগস্ট ৩১, ২০২৫
ভ্রমণবিলাসী সাইফুজ্জামান পাচার করেছেন ৬২০০ কোটি টাকা সাইফুজ্জামান চৌধুরী।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন ভ্রমণবিলাসী। মন্ত্রী থাকাকালে বিশ্বের ১৭টি দেশে ৫৪ বার ভ্রমণ করেছেন।

যখন যে দেশে ভ্রমণ করেছেন, তখন সে দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ পাচার করেছেন। সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার করেছেন যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে।

দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বিভিন্ন দেশে তাঁর ৫৮১টি ফ্ল্যাট/বাড়ি ও আটটি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেয়েছে দুদক।

নথিপত্র থেকে জানা গেছে, বাড়িগুলোর মূল্য তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্য দুই হাজার ৪২৩ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে তিনি ছয় হাজার ২৬৩ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। পাচার করা সম্পদ ফেরতের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে কমিশন। দুদক সূত্র জানায়, এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া শিগগিরই সিঙ্গাপুরেও এমএলএআর পাঠানো হবে।

এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছেন, পাচারকৃত অর্থ ফেরতের উদ্দেশ্যে লন্ডনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) ও দুদক একসঙ্গে কাজ করছে। বাংলাদেশ থেকে যাঁরা সম্পদ পাচার করেছেন তাঁদের একটি তালিকা এনসিএকে দেওয়া হয়েছে। লন্ডনে পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা বহু সম্পত্তি আমরা এনসিএর সহায়তায় জব্দ করতে পেরেছি। এ ছাড়া দেশে তাঁর বহু সম্পত্তি রয়েছে।

এ বিষয়েও টিম কাজ করছে। আশা করি, সেখানেও সাফল্য পাওয়া যাবে। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাইফুজ্জামান চক্রের বিরুদ্ধে কমিশন এরই মধ্যেই পাঁচটি মামলা করেছে। এসব মামলায় ১০৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে আরো একাধিক মামলার প্রস্তুতি চলছে।

১৭ দেশে ৫৪ বার ভ্রমণ : সাইফুজ্জামান ও তাঁর পরিবারের পাসপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত ১৭টি দেশে ৫৪ বার ভ্রমণ করেছেন তিনি। এর মধ্যে তিনটি ছিল  সরকারি ও বাকি ৫১টি ছিল ব্যক্তিগত সফর। ব্যক্তিগত সফরের পেছনে সাইফুজ্জামান  অঢেল অর্থ খরচ করেছেন। তিনি সরকারিভাবে সফর করেছেন যুক্তরাজ্য, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও  দক্ষিণ কোরিয়া। অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলার আসামিরা তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফ্রান্স ও আইসল্যান্ডে ব্যক্তিগতভাবে সফর করেছেন তিনি। প্রায় প্রতিটি সফরেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। স্ত্রী রুখমীলা জামানকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সফর করেছেন যুক্তরাজ্য। আর সেখানেই তিনি সবচেয়ে বেশি সম্পদ পাচার করেছেন।

কোন দেশে কত অর্থ পাচার : যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাইসহ বিশ্বের নানা দেশে সাইফুজ্জামানের ৫৮১টি ফ্ল্যাট/বাড়ি ও আটটি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেয়েছে দুদক। নথিপত্র অনুসারে ৫৮১টি সম্পত্তির মূল্য তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। আর আটটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য দুই হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ছয় হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ তিনি বিদেশে পাচার করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার করেছেন যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাজ্যে তাঁর ৩৪৩টি ফ্ল্যাট/বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি ফ্ল্যাট/বাড়ি ও দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ৯টি ফ্ল্যাট/বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। আর সিঙ্গাপুরে একটি ফ্ল্যাট/বাড়ি ও চারটি প্রতিষ্ঠানের হদিস পাওয়া গেছে। অন্যান্য দেশে পাচারের তথ্য আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য এমএলএআর পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পাঁচ মামলায় ১০৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ : সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী রুখমীলা জামানের বিরুদ্ধে এ যাবৎ পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। মামলাগুলোয় মোট ১০৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৩০ জুলাই, ২৪ জুলাই, ১৭ এপ্রিল এবং গত বছরের ৭ আগস্ট মামলাগুলো করা হয়। প্রতিটি মামলায়ই কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে তিনি এই ঋণ জালিয়াতিগুলো করেন বলে মামলার এজাহারগুলোয় বলা হয়েছে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৬/৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা; দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় মামলাগুলো করা হয়েছে।

সম্পদ জব্দ ও স্ত্রীসহ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ অক্টোবর সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। গত ১৭ অক্টোবর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা দেশে-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি/এপার্টমেন্ট/জমিসহ স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন আদালত। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি ও যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ৯টি। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ব্যাংকের হিসাব ও বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের হিসাব অবরুদ্ধের আদেশও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত ৫ মার্চ তাঁর ৩৯ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত। এসব হিসাবে তাঁর পাঁচ কোটি ২৬ লাখ ৮৩ হাজার ৮৫ টাকা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাইফুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী রুখমীলা জামানের নামে থাকা সব ধরনের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

২০১৩ সালের উপনির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন সাইফুজ্জামান। এরপর ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হলে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।