নিম্ন আদালতে ১৬৪ ধারায় শিশু সুমাইয়ার জবানবন্দি দেওয়ার সময় এমনই নির্মম নির্যাতনের কথা উঠে আসে। শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) তাকে আদালতে এনে জবানবন্দি নেওয়া হয়।
গত ৩ এপ্রিল ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম এলাকা থেকে সুমাইয়াকে অপহরণ করা হয়। ২৪ দিন পর গত ২৬ এপ্রিল রাতে কদমতলী থানার রহমতবাগের দক্ষিণ দনিয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে। সেদিন বৃষ্টি, তার বাবা সিরাজ মিয়া ওরফে বাবুলকে (৪৮) গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ সূত্রে বেলাল নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে বৃষ্টির বন্ধু বলে পরিচয় দিয়েছে।
খেলার ছলে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া বৃষ্টির দিকে ইঙ্গিত করে সুমাইয়া আদালতকে বলে, স্যার ওকে (বৃষ্টি) অনেক শাস্তি দেবেন। ও আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে, আমার আব্বু-আম্মুকেও অনেক কষ্ট দিয়েছে। তেমন কষ্ট ওকেও দেবেন। তা নাহলে ও আরও অনেককেই এমন কষ্ট দেবে। স্যার ওরে ফাঁসি দেবেন। ওকে ছাড়বেন না। সুমাইয়ার শিশুমুখে উঠে আসে তার ওপর বৃষ্টি ও তার সহযোগীদের অমানুষিক নির্যাতনের কথা। লাঠিপেটা, চড়-থাপ্পড়, কান্নাকাটি করলে গলা চেপে ধরা, এমনকি হাতের আঙুলের মাথায় নির্দয়ভাবে সুঁই দিয়ে খোঁচা দিয়ে যন্ত্রণা দেওয়ার বর্ণনা সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দেয়।
জবানবন্দিতে শিশু সুমাইয়া বলে, বৃষ্টি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। তার বাসায় নিয়ে একটা ঘরের ভেতরে তালা লাগিয়ে আটকে রাখে। কথায় কথায় আমাকে লাঠি দিয়ে মারধর করতো। আমার হাতে, গালে ও পিঠে অনেক মেরেছে। আম্মু-আব্বুর কাছে যেতে চাইলে আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, লোকজন জিজ্ঞেস করলে বলবি তোর মা-বাবা মারা গেছে, আর যদি না বলিস তবে তোকে আমি মেরে ফেলবো।
সুমাইয়া কামরাঙ্গীরচরের একটি মাদরাসায় পড়াশোনা করে। তার বাবা জাকির হোসেন স্থানীয় এ স্টিল কারখানার মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন।
আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর বিকেলে সুমাইয়াদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ঘরের সামনে থাকা বারান্দা ও উঠোনে সুমাইয়া ছোটাছুটি করছে। নিজে-নিজেই বিড়বিড় করে কথা বলছে। খানিকক্ষণ মায়ের কোলে বসে তো আবার ছুটে যায় বাবার কাছে। তার এই দুরন্তপনার মধ্য দিয়েই কথা হয়। সুমাইয়া বাংলানিউজকে জানায়, বৃষ্টি আমাকে অনেক মারধর করেছে, কষ্ট দিয়েছে। ঘরের ভেতরে তালা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। খেতে দিতো না। আব্বু-আম্মুর কাছে যেতে চাইলেই ও আমার হাতের আঙুলে সুঁই ফুটিয়ে ব্যথা দিতো। ওই বাসায় অনেকেই আসতো, আমাকে দেখে আবার তালা দিয়ে চলে যেতো।
সন্তানের মুখে এমন নির্দয় নির্যাতনের বর্ণনা শুনে কেঁদে ফেলেন তার মা মুন্নি আক্তার। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ২৪ দিন আমার বুক খালি ছিল। ওই বৃষ্টি আমার সন্তানকে নিয়ে অনেক নির্যাতন করেছে। একটা মেয়ে হয়ে এতোটুকুন শিশুর ওপর এমন নির্যাতন কেউ করতে পারে?
তিনি বলেন, মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর অনেকের কাছেই গিয়েছি। তবে পুলিশ আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল, দেশের যে প্রান্তেই থাকুক, যদি বেঁচে থাকে আপনার মেয়ে উদ্ধার হবেই।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. নাজির আহমেদ খান বাংলানিউজকে বলেন, ভুক্তভোগী শিশু আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। অপহরণকারীকে রিমান্ডের প্রথম দিন জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য পেয়েছি। যেহেতু তারা অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করেনি, তাই বোঝা যাচ্ছে, শিশুটিকে পাচারের উদ্দেশ্যেই অপহরণ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ সময়: ১৬২২ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৯, ২০১৭
এসজেএ/কেজেড/এইচএ/